বুধবার, ০৮ Jul ২০২৬, ০১:৪৯ অপরাহ্ন

অস্বাভাবিক জোয়ারে প্লাবিত দক্ষিণাঞ্চল, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট

পূর্ণিমার কারণে সৃষ্ট অস্বাভাবিক জোয়ারে দক্ষিণের উপকূলবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ১১টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে আছে পাঁচ হাজার পরিবার। বরগুনার তালতলীতে বাঁধ ভেঙে সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

বরিশাল বিভাগের অনেক জায়গায় নদী উপচে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। ফেরির আশপাশের এলাকা পানিতে ডুবে থাকায় জোয়ারের সময় যোগাযোগ বন্ধ থাকছে। আচমকা এই বিপর্যয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বহু মানুষ। পানি নিমগ্ন এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চাষাবাদে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, বেশির ভাগ জমিতেই পচে নষ্ট হয়ে গেছে ধানের বীজতলা ও সবজি।

বরগুনার তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া বাঁধ ভেঙে সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এখনো ঢুকছে জোয়ারের পানি। চার দিন ধরে এসব গ্রামে শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল শনিবার পায়রা (বুড়িশ্বর) নদীর পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

পানিতে তলিয়ে থাকা এলাকাগুলোর বাসিন্দারা বিশুদ্ধ পানির খোঁজে গ্রামের পর গ্রাম ছুটে চলছে। বেশির ভাগ ডিপ টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে থাকায় উঁচু স্থানের টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করছে সবাই। ঠিকমতো রান্না করতে পারছে না মানুষ।

তালতলী উপজেলার নিদ্রাসকিনা গ্রামের আকলিমা ও জোলেখা বেগম জানান, বসতঘর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চার দিন ধরে তাঁদের চুলা জ্বলছে না। এখনো পানি কমেনি। পরিবারে বয়োবৃদ্ধসহ শিশুদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের ষাট বছরের বৃদ্ধ সোলায়মান মাঝি বলেন, ‘পাঁচ দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের জন্য পাশের গ্রামের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি থেকে খাবার রান্না করে আনছি। এ ছাড়া এলাকার বেশির ভাগ ডিপ টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লবণ পানি ঢুকে পড়েছে। তাই বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে ভুগছে হাজারো মানুষ।

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, পানি কমে গেলেই তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের ভাঙা বাঁধ সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম সাদিক তানভীর বলেন, বেশির ভাগ ডিপ টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত স্থানীয় জনপ্রতিনিধের মাধ্যমে ১০৭টি পরিবারের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দুর্গাবাটিতে খোলপেটুয়া নদীর উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধ ভেঙে এ পর্যন্ত ১১টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে ভেসে গেছে হাজার বিঘা মত্স্যঘের ও ফসলি জমি। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার। এরই মধ্যে প্লাবিত এলাকায় সুপেয় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্লাবিত হওয়ায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে রান্নাঘরসহ অনেকের কাঁচা ঘরবাড়ি। ভেঙে পড়েছে বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, খুব শিগগির ভাঙনকবলিত বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করা হবে। দুর্যোগকবলিত মানুষের সুপেয় খাবার পানির সংকট নিরসনে দুর্গাবাটিতে রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট চালু করা হবে। এ ছাড়া পানিবন্দি পরিবারগুলোকে জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে।

পাউবো সাতক্ষীরা-২-এর এসডি জাকির হোসেন জানান, পাউবো থেকে বস্তা, দঁড়ি, বাঁশ ও পেরেক সরবরাহ করা হয়েছে। ৫৫০ ফুট এলাকায় পাইলিং করার জন্য আজ রবিবার থেকে কাজ শুরু করা হবে।

বরিশাল বিভাগের ২৩ নদীর মধ্যে প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ১০ নদীর পানির প্রবাহ এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েক দিন ধরেই নদীগুলোর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, ভোলার খেয়াঘাট এলাকার তেঁতুলিয়া নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, দৌলতখান উপজেলার সুরমা ও মেঘনা নদীর পানি ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, তজুমদ্দিন উপজেলার সুরমা ও মেঘনা নদীর পানি ১০৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বই?ছে।

এ ছাড়া ঝালকাঠি জেলায় বিষখালী নদীর পানি ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলায় বুড়িশ্বর/পায়রা নদীর পানি ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, বরগুনায় বিষখালী নদীর পানি ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, পাথরঘাটায় বিষখালী নদীর পানি ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, পিরোজপুরে বলেশ্বর নদীর পানি দুই সেন্টিমিটার এবং উমেদপুরে কচা নদীর পানি ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বরিশাল পাউবোর জলানুসন্ধান বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মাসুম ব?লেন, পূর্ণিমার প্রভাবে বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্ষা মৌসুমে এই চিত্র বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিক।

বরিশাল আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক মাজহারুল ইসলাম বলেন, বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ বিদ্যমান থাকায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক রয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com